31.1 C
Kolkata
Thursday, May 13, 2021

মুনিয়ার ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতা

Must read

বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের সংবাদ প্রকাশ নিয়ে সঙ্কটে পড়েছে সাংবাদিকতা। বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন একাধিক মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠানের এমডির অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়নি। একজন তরুণীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে বসুন্ধরা এমডি অভিযুক্ত হওয়ার পরেও মিডিয়াগুলো সেই সংবাদকে গুরুত্ব দেয়নি। তাদের নিজস্ব মিডিয়ার বাইরে আরও অনেক মিডিয়াও শুরুতে নাম উল্লেখ করেনি। এ নিয়ে যে সমালোচনা চলছে সেটা যৌক্তিক। এই সমালোচনার মধ্যে দেশের সামগ্রিক সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন করছেন কেউ কেউ। ধারণা করছি এটা সংক্ষুব্ধ হওয়া থেকেই। এই সংক্ষুব্ধ হওয়া অযৌক্তিক না হলেও কিছু ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের হচ্ছে, সেটা বলাই বাহুল্য।

দেশের প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াগুলোর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত কিছু করপোরেট হাউজের। মালিক দেখে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ অমূলক নয়, বলা যায় বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক নেতা দেখেই টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগের সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের যেমন মিডিয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তেমনই বিএনপির সময়ে বিএনপির নেতারাই পেয়েছিলেন অগ্রাধিকার। এখানে মিডিয়ার অনুমোদন মালিকভিত্তিক হয়ে ওঠায় সম্পাদকীয় নীতিকে আগে থেকেই যাচাইয়ের সুযোগ ছিল সীমিত অথবা ছিলই না। ফলে মালিকপক্ষ তাদের কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। কর্মীদের অনেকেই মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে, অথবা সময়ে সময়ে যখন মালিকপক্ষের বিপক্ষে সংবাদ তৈরি হয় তখন সেইসব প্রতিষ্ঠান সেই সংবাদকে এড়িয়ে যায় বা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এখানে মালিক ও কর্মীর সম্পর্ক থাকে বলে স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চার অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

মালিকপক্ষের বাইরে আরও কিছু বাধা সামনে আসে যেখানে বিভিন্ন করপোরেট হাউজের বিজ্ঞাপনে নির্ভর থাকে অনেক প্রতিষ্ঠান। বিজ্ঞাপনদাতাদের স্বার্থ পরিপন্থী সংবাদ তৈরি হলে বিজ্ঞাপনভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বসুন্ধরার এমডির ক্ষেত্রেও সেটা ঘটছে। তাদের মালিকানাধীন মিডিয়াগুলোর বাইরে আরও অনেকেই সেই সংবাদগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না মূলত বিজ্ঞাপন হারানোর শঙ্কায়। এতে করে এই বিজ্ঞাপনও মিডিয়ার সম্পাদকীয় নীতিতে প্রভাব ফেলছে। অথচ স্বাধীন সাংবাদিকতায় মালিকানা কিংবা বিজ্ঞাপন সম্পাদকীয় নীতির প্রভাবক হতে পারে না।

বসুন্ধরা গ্রুপ দেশের যে মিডিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে তার মধ্যে রয়েছে টেলিভিশন, দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন গণমাধ্যম, রেডিও। বলা যায় গণমাধ্যমের সকল পর্যায়েই তাদের উপস্থিতি। এর বাইরে তাদের প্রভাব আছে বিজ্ঞাপনের বাজারেও। সরাসরি মালিকানা না থাকলেও বিজ্ঞাপনের কারণে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানেও রয়েছে তাদের অপ্রত্যক্ষ প্রভাব, যা সরাসরি মালিকানার চাইতেও কম না। ফলে সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্ত্বেও তাকে যতটুকু এবং যেভাবে উপস্থাপন করা দরকার সেভাবে করেনি তারা। উলটো প্রাণের অপচয়ের শিকার তরুণীর মৃত্যুতে তারা অপপ্রচার ও চরিত্র হননে মেতেছে। এই অপপ্রচার ও চরিত্রহননের অপচেষ্টা যে মালিকানা ও বিজ্ঞাপন থেকে যে উদ্ভূত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিছু ব্যতিক্রম বাদে রাজধানীকেন্দ্রিক মিডিয়াগুলোকে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া ধরা হয়, অথবা বলা যায় প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াগুলোর অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকার খবরের প্রভাবও পড়ে সারাদেশে। দেশের নানা জায়গায় নানা সময়ে ঘটে যাওয়া আলোচিত ঘটনাগুলোর উল্লেখে মানুষ ঢাকাকেন্দ্রিক মিডিয়াগুলোর সূত্রকেই উল্লেখ করে থাকে। এই অনলাইনের যুগেও তবু স্থানীয় পর্যায়ের মিডিয়াগুলোকে এখনও মানুষ আস্থায় আনতে পারেনি। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে সেটা উদাহরণের পর্যায়ে ওঠে আসতে পারেনি এখনও। স্থানীয় মিডিয়াগুলোর ক্ষেত্রে এখানে জাতীয় পর্যায়ের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি খুব বেশি নেই তবে স্থানীয় যে বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সেটাও অনেকের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় নীতিতে ভাগ বসিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় এই স্থানীয় মিডিয়াগুলো নেই বলে বসুন্ধরার এমডির নিউজ-কিলিংয়ে ঘটনা আলোচনা হচ্ছে না। এটাও গণমাধ্যমের সাংবাদিকতাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে না ওঠারও উদাহরণ। এখানেসহ সবখানে ব্যক্তির নীতিতে পর্যুদস্ত সাংবাদিকতা।

বসুন্ধরার এমডির সংবাদ নিয়ে তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকতা চর্চার যে উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে, তা দিয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে প্রান্তের সাংবাদিকরাও সমালোচিত হয়েছেন, হচ্ছেন। এটা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিনির্ধারকদের অনৈতিক চর্চা থেকে উদ্ভূত অপসাংবাদিকতা; যার খেসারৎ দিচ্ছে পুরো প্রতিষ্ঠান। কেন্দ্রের নীতিনির্ধারকপক্ষ মালিকপক্ষের স্বার্থ অথবা আব্রু রক্ষায় যে অপসাংবাদিকতা চর্চার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেখানে কেন্দ্রে বসেও অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা ও প্রভাবহীনতার কারণে অথবা চাকরি হারানোর ভয়ে অনেকেই কিছু বলতে পারছেন না; সহ্য করে যাচ্ছেন। এই বলতে না পারা কিংবা স্বপ্রণোদিত চুপ হয়ে থাকা কি সাংবাদিকতার চর্চা? মনে ত হয় না, কারণ সাংবাদিকতা অন্য পাঁচ-দশটা পেশার মতো মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের মতো না। এখানে স্রেফ প্রতিষ্ঠানের মালিক ও নীতিনির্ধারকদের কারণে যে বা যারা অপবাদের ভাগিদার হচ্ছেন তারা কি নিজেদের ছোট্ট ক্ষেত্র থেকেও নিজের অবস্থান প্রকাশ্য করতে পারেন না? হয়ত প্রভাবহীন এই প্রতিবাদ, তবু অনৈতিক চর্চার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ।

মিডিয়ার এই নীতিনির্ধারক যারা তাদের অনেকেই আবার সাংবাদিক নেতা, টেলিভিশন চ্যানেলে রাতের টকশোজীবী, দেশজুড়ে তাদের পরিচিতিও বিশাল। তবু সুস্থ সাংবাদিকতা চর্চায় তারা পেছনের সারির লোক। তারা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে রাজনীতিবিদদের সবক দেন, নীতির বুলি আওড়ান প্রতি রাতে, নীতিকথা লিখেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে। কিন্তু নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে সুনীতি না হোক অন্তত ন্যূনতম সাংবাদিকতা চর্চায় তারা অক্ষম। এই দ্বিচারিতা তাদেরকে লজ্জিত করে না। এ অদ্ভুত এক স্বার্থের খেলা যেখানে অর্থই মুখ্য, পেশাগত পরিচিতি স্রেফ মুখোশ প্রতিরূপ!

বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের দুর্বৃত্তপনায় যে সকল সাংবাদিক নিজ নিজ গণমাধ্যমে নিউজ-কিলিংয়ের মাধ্যমে সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন তারা স্রোতের বিপরীতে হলেও সুস্থ সাংবাদিকতা চর্চায় ঋজু হয়ে দাঁড়ালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। তারা সেটা পারেননি। তাদের এই ব্যর্থতার দায় শোধ করতে হচ্ছে সাংবাদিক সমাজকে, কলঙ্কিত করছে সাংবাদিকতার মহান পেশাকেও। বিরুদ্ধ সময় ভেদ করা সঠিক সংবাদ পরিবেশন যেখানে সাংবাদিকতা সেখানে কিছু প্রতিষ্ঠানের কতিপয় নীতিনির্ধারকের সম্পাদকীয় নীতি মালিকপক্ষের হাতে সপে দেওয়ার উদাহরণ আরও একবার আমাদের সাংবাদিকতাকে কলঙ্কিত করেছে। এখানে কোনো অজুহাতের কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। মালিকপক্ষের কাছে তারা সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন না করে দাস হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। এই দাস মনোবৃত্তি কেবল তাদের নিজেদেরকেই ছোট করেনি, সাংবাদিকতা পেশারও মর্যাদাহানি করেছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক

(function(d, s, id) {
var js, fjs = d.getElementsByTagName(s)[0];
if (d.getElementById(id)) return;
js = d.createElement(s);
js.id = id;
js.src=”https://connect.facebook.net/en_US/sdk.js#xfbml=1&version=v3.1&appId=356135471795649&autoLogAppEvents=1″;
fjs.parentNode.insertBefore(js, fjs);
}(document, ‘script’, ‘facebook-jssdk’));

Source

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article