31 C
Kolkata
Friday, May 7, 2021

উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের অভিভাবক

Must read

জন্মশতবর্ষে সত্যজিৎ

দেখতে দেখতে ২০২১ সালের ২ মে তারিখটা এসে গেলেও কাঙ্ক্ষিত উৎসব আর আয়োজন করা গেল না কোভিডের কারণে। বাঙালি সংস্কৃতিসেবীদের বিশেষ করে চলচ্চিত্রানুরাগীদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল নানা সমারোহে এই উৎসব আয়োজনের। সত্যজিৎ জন্মজয়ন্তী। সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উদযাপন। নিয়তির নির্মম পরিহাস।

এক কথায় বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের পর বহুধা বৈচিত্র্যে যিনি বাংলা সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন তিনি সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সংগীত, অংকনশিল্প, প্রকাশনা, পত্রিকা সম্পাদনা, সব শাখায় তাঁর মৌলিক সৃষ্টি ও প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কেবল যে পরিপুষ্ট করেছেন তা নয়, বাঙালি জাতিকে এসব ক্ষেত্রে চরম আধুনিকতার স্বাদে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন।

বিশ্ব জুড়ে এখনো যে ক’জন মানুষের পরিচয়ে বাঙালির বিশ্বজোড়া পরিচিতি, তাঁদের অন্যতম একজন সত্যজিৎ রায়। মননে, মেধায়, ব্যক্তিত্বে, প্রয়োগে আধুনিকতম একজন মানুষ। মননে, রুচিতে, বোধে এবং শিল্পের অনুধাবনে যিনি বাঙালিকে আধুনিকতার ঠিকানা এনে দিয়েছিলেন, এনে দিয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রে প্রকৃত রেনেসাঁর সন্ধান। বাংলা চলচ্চিত্রকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের অঙ্গনে।

সারা পৃথিবীর কাছে সত্যজিৎ রায়ের পরিচিতি একজন সেরা চলচ্চিত্রকার রূপে। আমাদের এই উপমহাদেশের নানান জাতির কাছেও তাই। কিন্তু বাঙালির কাছে তাঁর পরিচয় কেবল একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে কখনো নয়। তিনি শুধু চলচ্চিত্র শিল্পের মাধ্যমেই নয়, নানাভাবে বঙ্গসংস্কৃতিকে সম্পদশালী করে গেছেন। তাই বাঙালির কাছে সত্যজিৎ রায় তার সংস্কৃতির অভিভাবক, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পরে।

যে পরিবারে সত্যজিতের জন্ম ১৯২১ সালে, সে পরিবারের কয়েক প্রজন্মের অনেক সদস্য বঙ্গসংস্কৃতিকে নানাভাবে পরিপুষ্ট করেছেন। পারিবারিক পারিপার্শ্বিকতার গুণে সত্যজিৎও সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন বটে, তবে তা সম্পূর্ণ মৌলিক ও অভিনবভাবে। আর সেই মৌলিকত্ব ও অভিনবতা কেবল প্রতিভাগতভাবে অর্জিত নয়, এটা তাঁকে অর্জন করতে হয়েছে নিরলস পরিশ্রম ও অবিরাম চর্চার মধ্য দিয়ে।

অতি শৈশবে পিতৃহারা হয়ে রীতিমত জীবন যুদ্ধে যুঝতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু আকৈশোরের সংস্কৃতি চর্চা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে অভীষ্ট লক্ষ্যে। এই জীবনবীক্ষণের চিত্র আমরা দেখি তাঁর দ্বিতীয় শেষ ছবি শাখা-প্রশাখায়। সেখানে মূল চরিত্রের মুখে আমরা শুনি, পরিশ্রম ও সততাই হলো জীবনের উত্তরণের প্রধান দুটি সোপান।

সত্যজিতের সময়ে বাংলা মূলধারার চলচ্চিত্রও যথেষ্ট পরিণত ও মানসম্মত হয়ে উঠেছিল। একে তো তিনি সকলের মাথার উপর অভিভাবকের ছায়া দিয়ে গেছেন, তার উপর তাঁর নির্মাণদলের বিভিন্ন শিল্পী কলাকুশলীরা মূলধারার সিনেমায়ও কাজ করতেন। এছাড়া অনেকে সরাসরি তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলে নির্দ্বিধায় তিনি সাহায্য করে যেতেন।

সোনার চামচ মুখে নিয়ে না জন্মালেও সত্যজিৎ জন্মেছিলেন সোনার কাঠি হাতে নিয়ে, যার পরশে বাংলা তথা উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র সাবালকত্ব পেয়েছে। চলচ্চিত্রাভিনয়, চলচ্চিত্র সংগীত এবং চলচ্চিত্র সাহিত্যে তিনি যেমন এনেছেন আধুনিকতার দিশা, তেমনি নিজের মৌলিক চিন্তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রকৃত প্রকরণের মিশেলে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখাতে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছেন।

চলচ্চিত্রের বাইরে বাংলা প্রকাশনা শিল্পে এবং অংকন শিল্পেও তিনি তাঁর পূর্ববর্তী দুই পুরুষের উত্তরাধিকারকে আরো সমৃদ্ধ করে গেছেন। বাংলা সাহিত্যেও তাঁর মৌলিক অবদান—গোয়েন্দা সাহিত্য ও ছোটগল্পে।

উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে সত্যজিৎ রায় উপহার দিয়েছেন অনেক প্রতিভাবান অভিনয় শিল্প ও কলাকুশলী। তাঁর এই আবিষ্কারের মধ্যে করুণা বন্দোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, সন্তোষ দত্ত, রবি ঘোষ, জয়া ভাদুড়ী, দীপংকর দে, কুশল চক্রবর্তী, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, জয়শ্রী, অলকানন্দা রায়, প্রদীপ মুখোপাধ্যায় অন্যতম। স্যার রিচার্ড এ্যাটেনবরোর মতো ডাকসাইটে অভিনেতা ও পরিচালক সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করেছেন। কলাকুশলীদের মধ্যেও রয়েছেন অনেকে, যাদের মধ্যে সুব্রত রায়, সৌম্যেন্দু রায়, বরুণ রাহা অশোক বসু অন্যতম।

একজন শিল্পীর জীবনের শেষ কাজকে বলা হয়, ‘সোয়ান সঙ।’ মহৎ শিল্পীদের সোয়ান সঙে তাঁদের জীবনের সামগ্রিক শিল্পকৃতির নির্যাসের প্রতিফলন ঘটে থাকে। সত্যজিৎ রায়ের সোয়ান সঙ ছিল ‘আগন্তুক’ (১৯৯২)। সত্যজিৎ নিজেও বলেছেন এই ছবির বিষয়বস্তু তাঁর সারা জীবনের দর্শন। ছবির মূল চরিত্র মনমোহন মিত্র সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভু। এই চরিত্রের মুখে সত্যজিৎ বলে গেছেন তাঁর সারা জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার কথা। সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম সেরা এই সৃষ্টি তাঁর জীবন দর্শনের চলচ্চৈত্রিক দলিল হয়ে রয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যের মাধ্যমে আমরা বুঝে নিতে পারি অনেকটা এই চলচ্চিত্রস্রষ্টাকে।

মহৎ শিল্পীরা সুদূরদৃষ্টি সম্পন্ন হন। সত্যজিৎ রায়ও তেমনি। আজ এই উপমহাদেশ জুড়ে যে ধর্মীয় হানাহানি, ধর্ম নিয়ে কুটিল রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে সুবিধাবাদের যে চরম অস্থিরতা তার প্রথম ইঙ্গিত তিনি দিয়েছিলেন ১৯৬০ সালে দেবী ছবিতে, তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে, একটি পরিবারের কাহিনীর (গল্প প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়) মধ্য দিয়ে।

জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে তিনি এ বিষয় এনেছেন ‘গণশত্রু’ (১৯৯০) চলচ্চিত্রে।

আজ পরিবেশ নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে যে সচেতনতা— প্রচার প্রচারণা তারও উল্লেখ আমরা পাই ১৯৬২ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিতে। এই ছবির গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র জগদীশ ছিলেন পরিবেশবিদ। ছবিতে এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। চরিত্রটির বিভিন্ন মুভমেন্ট ও সংলাপের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় পুরো বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

স্বভাবতই দেশের বিদেশের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পদক পেয়েছেন তিনি কিছু কিছু পুরস্কার নিজেই সম্মানিত কিংবা গুরুত্ববাহী হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার সাধারণ জনগণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা যা তিনি এখনো পেয়ে চলেছেন সারা বিশ্ব জুড়ে। আশা করি পেয়েও যাবেন।

একটা গাছের শেকড় যতই মাটির গভীরে যায়, তার শেকড়ের পরিধি তত বিস্তৃত হয়, তার শীর্ষবিন্দু আকাশ ছুঁতে চায়, তার শাখা-প্রশাখা চতুর্দিকে প্রসারিত হয়। সত্যজিৎ রায়ও তেমনি এক মহাবৃক্ষ যাঁর শেকড় বাংলার মাটির গভীরে প্রোথিত। আর তার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে গেছে সারাভুবন জুড়ে।

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায় প্রয়াত হয়েছেন। দীর্ঘ ২৯ বছরেও তাঁর স্মৃতি এতটুকু ম্লান হয়নি। প্রাসঙ্গিকতা ও চর্চা বরং ক্রমবৃদ্ধিমান। শততমবর্ষে তাঁকে যথাযথভাবে উদযাপন করা যাচ্ছে না এই দুঃখ মনে নিয়েও প্রত্যাশা করা যায় সত্যজিৎ রায় তাঁর দ্বিতীয় শতকেও অম্লান হয়ে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে। তাঁর ছবিগুলো চলচ্চিত্র শিক্ষণ ও বীক্ষণের ক্ষেত্রে আরো আদরণীয় হয়ে উঠবে। জন্মশতবর্ষের এই পূণ্যলগ্নে তাঁর প্রতি আমাদের সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা, সভাপতি, চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র ও খণ্ডকালীন শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।



Source

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article